বর্তমানে যেখানে বেসরকারি স্কুলগুলো যথেষ্ট সুসজ্জিত এবং প্রতিটি শ্রেণীর জন্য আলাদা করে কক্ষ এছাড়া যথেষ্ট শিক্ষক-শিক্ষায় নিয়ে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠান শুরু হয় অন্যদিকে সরকারি স্কুলগুলোতেও পরিমিত শিক্ষক-শিক্ষিকা ও আলাদা আলাদা শ্রেণিকক্ষ থাকলেও প্রত্যন্ত গ্রামে এখনো এমন স্কুল রয়েছে, যেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক কষ্ট করে মাটিতে বসে পড়াশোনা করছে। তাদের এই অসুবিধা ও বিভিন্ন সমস্যা হার মেনে নিয়েছে তাদের অদম্য পড়াশোনার ইচ্ছার জেদের কাছে। এমনই ঘটনা ঘটেছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়্গপুর গ্রামীণ থানার রাজবালা বালিহাটি জুনিয়র হাইস্কুলে।
বর্তমানে এই স্কুলের ছবিটি দেখলে পুরনো দিনের পাঠশালার কথা মনে পড়বে। খোলা আকাশের নিচে চাটাইয়ের উপর 300 মতন নবম দশম শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রী। আর এই ৩০০ মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা রয়েছে সর্বাধিক প্রায় ২০০। এই স্কুলের অংকের শিক্ষিকা গাছের উপর কালো ব্ল্যাকবোর্ড ঝুলিয়ে অঙ্ক শেখাচ্ছে তার সাথে সাথে অংক বুঝিয়ে দিচ্ছে শিক্ষিকা। এরকম দৃশ্য যদিও এখনো দেখা যায় না, তবে এই দৃশ্যই ধরা পড়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত একটি গ্রামীণ সরকারি স্কুলে।
যদিও কিছু মাস আগে এই স্কুলে মাধ্যমিকের অনুমোদন ছিল না আর অন্যদিকে এই গ্রামের মধ্যে কোন হাই স্কুল না থাকার জন্য নদী বা জাতীয় সড়ক পেরিয়ে মেয়েদের 10 কিলোমিটার যেতে হতো। যেহেতু প্রত্যন্ত গ্রাম তাই অতদূরে মেয়েদের পড়াশোনা করতে দিতে চাইতো না অভিভাবকরা। এই গ্রামের ৯০% মেয়েদের পড়াশোনা না করিয়ে বাল্যবিবাহ দিয়ে দেওয়া হতো। তবে এই ঘটনার পরিবর্তন ঘটে 2025 এর আগস্ট মাস নাগাদ। যখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘাটালের বন্যার বেহাল দশা পরিদর্শন করতে আসেন তখন এই স্কুলের শিক্ষিকারা কয়েকজন ছাত্রীকে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ির সামনে চেচিয়ে বলতে থাকে “দিদি দাঁড়ান আমরা পড়তে চাই”
এই একটা বাক্য দাঁড় করিয়ে দেয় মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িকে। মুখ্যমন্ত্রী সমস্ত রকম সমস্যার কথা শুনে এবং সেই গ্রামের মেয়েদের পড়ার ইচ্ছের কথা জানতে পেরে স্কুলটিকে মাধ্যমিক স্তরের অনুমোদন করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। আর তারপর থেকেই এই স্কুলের উপযুক্ত শ্রেণী কক্ষ না থাকায় নবম ও দশম শ্রেণীর ক্লাস হতে থাকে খোলা আকাশের নিচে।
তবে এই স্কুলের যে তিনজন শিক্ষার্থী রয়েছেন যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে এতগুলো ক্লাস মেইনটেইন করেন এবং ছাত্রীদের পড়াশোনার এই ইচ্ছেকে উৎসাহ দেন তারাই মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দ্বিতীয়বার আবেদন জানাতে চান। স্কুলের আশেপাশে অনেক ফাঁকা জায়গা রয়েছে, তাই সেখানে অন্তত দুটো শ্রেণিকক্ষ ও শৌচালয় গড়ে দেওয়া হয়, তাহলে আসন্ন গরম ও বর্ষার সময় অনেকটাই উপকৃত হবে এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জগন্নাথ মণ্ডল এবং সহ-শিক্ষক সুব্রত সিংহ জানিয়েছেন, এই গ্রামের মেয়েদের পড়াশোনার এতটাই ইচ্ছে এবং এই ইচ্ছেকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য ও বাল্যবিবাহ রোধ করার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে মাধ্যমিকের অনুমোদন দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়। অনুমোদন পাওয়ার আগে থেকেই অষ্টম উত্তীর্ণ ৩০ জন ছাত্র ও ছাত্রীকে নিয়ে গাছ তলায় পড়ানোর বন্দোবস্ত করেন। যদিও সরকারি ভাবে এই পড়ুয়ারা এই স্কুলের ছাত্র বা ছাত্রী ছিল না। যেহেতু জনার্দনপুর হাই স্কুল ১০ কিলোমিটার দূরে তাই তাদের যাতায়াতের অসুবিধা হতো বলেই শিক্ষা দপ্তর এবং স্কুলের অনুমতি নিয়েই এই স্কুলেই ক্লাস করাতেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। এরপর 2026 সালে অনুমোদন পাওয়ার পর ৮২ জন ছাত্রছাত্রী নতুন ভর্তি হয় আর বর্তমানে মোট ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫০ এর মতন।
খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করানো খুবই অসুবিধার হচ্ছে, বিশেষ করে সামনে গরমকাল আসতে চলেছে আর এই গরমের মধ্যে বাইরে ক্লাস করানো সম্ভব নয়। বিভিন্ন দপ্তরে স্কুলের তরফ থেকে শ্রেণিকক্ষ করে দেওয়ার জন্য আবেদন জানানো হয়েছে, তবে এখনো পর্যন্ত সেই আবেদনের কোন রকম প্রতিক্রিয়া মেলেনি এমনটাই জানিয়েছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং সহশিক্ষক।
যদিও এই বিষয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের ভারপ্রাপ্ত ডিআই তথা খড়্গপুর মহকুমার এডিআই উত্তম মাজি জানিয়েছেন, কোন দপ্তরে আবেদন জানিয়েছেন তিনি তা জানেন না, তবে এই বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখবেন তিনি। তবে তিনি জানিয়েছেন, তাদের দপ্তরে জমা করলে আবেদনপত্র দ্রুত উদ্বোধন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। স্কুলের শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও দেখা হবে তার সাথে স্কুলে নতুন ক্লাস নির্মাণ এবং শৌচালয় নির্মাণের বিষয়টি করে দেওয়া হবে। এমনটাই আশা দেখিয়েছেন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পরিষদের সভাধিপতি প্রতিভা মাইতি সহ- সভাধিপতি তথা স্থানীয় বিধায়ক অজিত মাইতি।
এখন এটাই দেখার কবে এই পড়াশোনার অদম্য জেদ বহনকারী ছাত্র-ছাত্রীরা মাথার ওপর ছাদ পেতে চলেছে। যার ফলে তাদের শিক্ষা একটা অনুকূল পর্যায়ে যেতে পারে।