সরকারি স্কুলগুলো সাধারণত খুবই সাধারণ ভাবে তৈরি করা হয়ে থাকে। খুব একটা জাঁকজমকপূর্ণ বা শৌখিনতার ছাপ সেখানে দেখা যায় না। বর্তমানে বেশিরভাগ সরকারি স্কুলগুলো যেন ভগ্নপ্রায় দশা। কিন্তু তার মধ্যেও দৃষ্টান্ত তৈরি করল উত্তর 24 পরগনা জেলার বসিরহাট সীমান্তবর্তী গ্রাম দণ্ডিরহাটের একটি সরকারি স্কুল। স্কুলটি যেন আস্ত একটি দূরপাল্লার ট্রেন। আর এই অদ্ভুত শৌখিন ধরনের স্কুলে বাড়তে চলেছে পড়ুয়াদের সংখ্যা। ব্যাপারটি বিস্তারিত জানতে হলে সম্পূর্ণ প্রতিবেদনটি পড়ে ফেলুন।
সরকারি স্কুলের মধ্যে তেমন কোনো জাঁকজমক বা শৌখিনতা থাকে না বলে পড়ুয়াদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তেমনটা লক্ষ্য করা যায় না। কারণ শিশু মন একটুখানি আকর্ষণের দিকে এগিয়ে যায়। এর জন্যই পড়ুয়াদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বসিরহাটের সরকারি স্কুলটি এমনভাবে রং করা হয়েছে, যে স্কুলটিকের নীল সাদা রঙের একটি ট্রেনের আদলে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এইরকম ট্রেনের মধ্যে পড়াশোনা করতে আগ্রহ বাড়িয়েছে খুদে পড়ুয়ারা। বর্তমানে সরকারের তরফ থেকে স্কুলগুলোকে আপডেটেড করার জন্য তেমন কোনো অর্থনৈতিক সাহায্য দেওয়া হয় না বললেই চলে। তবুও এই আর্থিক সংকটের মধ্যে আধুনিকতা ও নান্দনিকতার ছোঁয়া দেখা গেল বসিরহাটের একটি সীমান্তবর্তী গ্রামের সরকারি প্রাইমারি স্কুলে। আর এই সম্পূর্ণ নতুনত্বের ছাপ আনার জন্য সম্পূর্ণ অবদান রয়েছে ওই স্কুলেরই সদ্য নিযুক্ত হওয়া চার শিক্ষকের।
বর্তমানে সরকারি স্কুল গুলোর মান আগের থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। এর জন্য বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীরা বেসরকারি স্কুলেই পড়াশোনা করে থাকে। তার মধ্যে দণ্ডিরহাট হল একটি সংখ্যালঘু অধিষ্ঠিত এলাকা। এই জায়গায় একমাত্র প্রাথমিক সরকারি বিদ্যালয় হিসেবে দণ্ডিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬২ সালে। তবে ছাত্র ছাত্রীদের সংখ্যা কম থাকার জন্য অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকারা বাধ্য হয়ে বদলি করেন অন্যত্র। সমস্ত শিক্ষক বদলি হয়ে যাওয়ায় শিক্ষকের সংখ্যা কমে ধারায় মাত্র একজন। এর ফলে পড়াশোনার মান অনেকটাই নিচে নেমে যেতে থাকে। যার কারণে সেখানকার অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে পাঠাতে শুরু করেন।
আরোও পড়ুন : নয়া নিয়ম জারি EPFO তে, UPI ব্যবহার করে PF থেকে সর্বোচ্চ টাকা তোলার নিয়ম জানুন!
তবে সম্প্রতি এই স্কুলে বদলি হয়ে এসেছে চারজন শিক্ষক। স্কুলের এমন দশা দেখে তারাই এই অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তাই তাদের ভাবনায় স্কুলটিকে পড়ুয়াদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এবং স্কুলে আসার আগ্রহ বাড়ানোর জন্য স্কুলটিকে রেলগাড়ির কামরার মতন করে রং করা হয়েছে। যেন মনে হতে থাকে ট্রেনে চড়তে চড়তে ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশোনা করছে। যদিও জানা যাচ্ছে, সরকারের তরফ থেকে কোনো রকম আর্থিক সাহায্য পাওয়া যায়নি স্কুলের এই রূপ বদলানোর জন্য। চারজন শিক্ষক নিজের টাকা খরচ করে এরকম নান্দনিক চিত্র তুলে ধরেছেন। তবে স্কুল রং করতে গিয়ে আলাদা করে ঘর তৈরি করা সম্ভব হয়নি শিক্ষকদের। এর জন্যই তিনটি ঘরে ছয়টি শ্রেণী ক্লাস করাতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষকরা। প্রি প্রাইমারি থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ুয়াদের তিনটি ঘরের মধ্যেই পড়াশোনা করানো হচ্ছে। তবে একটাই আশার আলো সেটা হল, আগের থেকে এই এক থেকে দেড় বছরে পড়ুয়ার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৩ জন। তবে যদি সরকারি সাহায্য মেলে তাহলে ঘরের সংখ্যা বা শ্রেণিকক্ষের সংখ্যা বাড়ানো যাবে সেক্ষেত্রে আরো পড়ুয়ারা আসার সম্ভাবনা থাকবে। ভবিষ্যতে সেই অঞ্চলের চারটি বেসরকারি প্রাথমিক স্কুলের থেকেও এই সরকারি স্কুলটি এগিয়ে থাকবে তবে তার জন্য প্রয়োজন সরকারি আর্থিক সাহায্যের।
এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিশ্বরূপ ঘোষ জানিয়েছেন, স্কুলের শৌচালয় পর্যন্ত মেরামত করার কাজ করছেন শিক্ষকদের অর্থের মাধ্যমে। এছাড়া কিছুটা ডোনেশনের মাধ্যমে স্কুলটিকে বেসরকারি স্কুলের মতন রুপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু সম্পূর্ণ বেসরকারি করণের মতন মান উন্নয়ন ঘটানো এবং বিশেষ করে শ্রেণিকক্ষ বাড়ানো শিক্ষকদের পক্ষে সম্ভব নয় তার জন্য দন্ডিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটাই আবেদন রয়েছে রাজ্য সরকারের কাছে, যদি তারা কিছুটা আর্থিক সাহায্য প্রদান করে এই স্কুলটি আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে এবং আরও পড়ুয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে এই স্কুলটি সেই অঞ্চলের চারটি বেসরকারি স্কুলের থেকে অনেক এগিয়ে থাকবে। অভিভাবকদের মধ্যেও বেসরকারি স্কুলের পরিবর্তে সরকারি স্কুলে পড়াশোনার জন্য আগ্রহ বাড়বে এবং তারা তাদের সন্তানদের সরকারি স্কুলে পড়ানোর জন্য চিন্তাভাবনা করবেন।